সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত ১২ মে প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে পরিচালিত বিভিন্ন পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। সেই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ থেকে বাষ্প তৈরি হয়ে টারবাইন ঘুরবে এবং সেখান থেকেই উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় নতুনভাবে যুক্ত হবে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নিরাপত্তাজনিত জটিল পরীক্ষার কারণে সময় আরও কিছুটা বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে দুই ধাপের অধিকাংশ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এখন দ্বিতীয় ধাপের শেষ পর্যায়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বাকি রয়েছে, যেগুলো সফলভাবে শেষ হওয়াই পরবর্তী অগ্রগতির মূল শর্ত।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং নিরাপত্তানির্ভর। তাই প্রতিটি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার পরই পরবর্তী ধাপে যাওয়া হচ্ছে। ফলে নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করা এখনই সম্ভব নয়।
রূপপুর প্রকল্পটি দেশের সবচেয়ে বড় একক অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি। পাবনার রূপপুরে রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এনপিসিবিএল।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলেও কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন কর্মক্ষমতা ও নিরাপত্তা পরীক্ষা চলবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী বছর একটি ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে।
রূপপুর কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সার্বক্ষণিক ও স্থিতিশীলভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতি দেড় বছর পরপর নতুন পারমাণবিক জ্বালানি সংযোজন করতে হবে। ব্যবহৃত জ্বালানি নিরাপদভাবে সংরক্ষণের পর রাশিয়ায় পাঠিয়ে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আগেই সমঝোতা হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্বে থাকবে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান টিভিএল। চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রটির পুরো কার্যকালজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যসূচক অনুসারে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা হবে এবং অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে চুক্তিতে সর্বোচ্চ সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। ফলে মোট ব্যয় বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
রূপপুরে উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য এখনো নির্ধারণ হয়নি। পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পর প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশ শেষে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে দাম চূড়ান্ত করা হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্মাণ ব্যয় বেশি হলেও পারমাণবিক জ্বালানির খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য প্রতিযোগিতামূলক থাকবে।
এদিকে পাওয়ার গ্রিড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রূপপুরের বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য জাতীয় গ্রিড প্রয়োজনীয়ভাবে প্রস্তুত রয়েছে। যদিও জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতা বা স্পিনিং রিজার্ভ নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা দেরি হলেও সব ধরনের পরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই শেষ করে উৎপাদনে যাওয়াই হবে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।